
ডেস্ক রিপোর্ট:
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কিছুদিন আগে লোহিতসাগরে আবারও হামলার কবলে পড়ে মার্কিন রণতরি। অন্যদিকে হুতিদের ওপর মার্কিন হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছে।
সম্প্রতি আল জাজিরা জানায়, হুতি যোদ্ধারা বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস হ্যারি ট্রুম্যান এবং তার সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজকে নিশানা করে ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি ড্রোন নিক্ষেপ করে। গত ১৫ মার্চ শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সেনাবাহিনীকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। এই হামলায় কমপক্ষে ৫৩ জন নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। ৪০টি অভিযানের বেশির ভাগই সানার উত্তরে হুতি-নিয়ন্ত্রিত প্রদেশে চালানো হয়। এরপরই মার্কিন রণতরিতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয় বলে জানা যায়।
ইয়েমেন কয়েক বছর ধরে উত্তপ্ত। লোহিতসাগরে নতুন করে হামলার খবরে তেলের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মানদণ্ড-ব্রেন্ট ফিউচার-৪১ সেন্ট বা ০.৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭০.৯৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই সংঘাত? বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি ইয়েমেন। ২০১৪ সালে শিয়া মুসলিম গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেওয়ার পর থেকে দেশটি গৃহযুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। এর পর হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর আকাশপথে হামলা আরো বেশি ধ্বংস ও দারিদ্র্য ডেকে এনেছে। তারপরও হুতিরা গত নভেম্বর থেকে সাগরপথে পণ্য পরিবহনের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে এবং এখন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর পালটা হামলা করছে। এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র (উত্তর ইয়েমেন) এবং গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন (দক্ষিণ ইয়েমেন) নামক দেশ দুইটিকে একত্র করে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়। সানা ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইয়েমেনের পশ্চিমে লোহিতসাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। এটি আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বাব এল মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন। দেশটির উত্তর ও উত্তর-পূর্বে সৌদি আরব এবং পূর্বে ওমান অবস্থিত। ইয়েমেনের আয়তন ৫ লাখ ২৭ হাজার ৯৭০ বর্গকিলোমিটার। ২০১৭ সালে ইতিহাসে ৮ দশকের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ হয় দেশটিতে। এতে দেশটিতে সরকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দেশটির বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা।
যার মধ্যে আছে রাজধানী সানা, দেশটির উত্তর অংশ এবং লোহিতসাগরের উপকূল অঞ্চল। এটা তাদের লোহিতসাগরের প্রবেশপথ হিসেবে খ্যাত বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দেয়, যা ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার যোগাযোগের সংক্ষিপ্ততম পথ এবং এটি তাদের অস্ত্রের আওতার ভেতরে।
হুতিরা গত ১৮ মাস ধরে ইয়েমেনের উপকূলের ব্যস্ত সমুদ্রপথ লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। এই হামলার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সামুদ্রিক পরিবহন সুয়েজ খাল থেকে আফ্রিকার মধ্য দিয়ে দীর্ঘযাত্রা করতে বাধ্য হয়েছে। গত জানুয়ারিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর, ইসরাইলি সংযোগহীন জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করে দেয় এই গোষ্ঠী। তবে, গোষ্ঠীটি গত সপ্তাহে বলেছে যে, ফিলিস্তিনি ছিটমহলে ইসরাইলের নতুন করে অবরোধের কারণে তারা লোহিতসাগরে সমস্ত ইসরাইলি জাহাজ চলাচলের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মনোযোগী ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কোনো নকশা রচনা করে এ হামলা শুরু করেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এবার যুক্তরাজ্য হুতিদের লক্ষ্য করে হামলায় অংশ নেয়নি। যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়মিত জ্বালানি সহায়তা করেছে। এখানে আমেরিকা শক্তি প্রয়োগ করেই যাচ্ছে। কিন্তু হুতিরা অপ্রতিরোধ্য রয়ে গেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে হুতিরা লোহিতসাগর এবং এডেন উপসাগরে কয়েক ডজন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট ছোট নৌকা দিয়ে হামলা করে আসছে। তারা দুইটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়, তৃতীয় আরেকটি আটক করে এবং চার জন নাবিককে হত্যা করে। বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষার জন্য পশ্চিমা যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন অথবা তাদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিমানের একাধিক রাউন্ড দিয়ে হামলার পরও এই গোষ্ঠীকে নিবৃত্ত করা যায়নি।
ইয়েমেন থেকে ইসরাইলে চারশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও সেগুলোর বেশির ভাগই গুলি করে ধ্বংস করা হয়। এর ফলে প্রধান শিপিং কোম্পানিগুলোকে লোহিতসাগর ব্যবহার বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ প্রায় ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজ এই সাগর ব্যবহার করে। এর পরিবর্তে এখন জাহাজগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার আশপাশে আরো দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন যে, এক বছরেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ সুয়েজ খালের ভেতর দিয়ে লোহিতসাগরে নিরাপদে যাতায়াত করেছে। এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সুয়েজ খালই দ্রুততম সমুদ্রপথ। এই পথ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য হুতিদের সরাসরি সম্বোধন করে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে লিখেছেন, “যদি তোমরা না থামো, তবে তোমাদের ওপর ‘নরক বৃষ্টি’ হবে, যা তোমরা আগে কখনো দেখোনি।” তার এই চণ্ডনীতি কতখানি হুতিদের ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে পারবে এ ব্যাপারে বিশ্লেষকরা সন্দিহান।