
সাজ্জাদ হসেন:
বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে আমাদের দেশেও পালিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘অ যবধষঃযু সড়ঁঃয , অ যবধষঃযু সরহফ।’
দিবস মানেই সচেতনতা, গত বছর প্রচারের মূল দিক ছিল—মুখের স্বাস্থ্য যদি ভালো না রাখা হয়, তাহলে দাঁতে গর্ত, ব্যথা, মাড়ি রোগসহ নানা ক্ষত শুধু মুখের মধ্যেই জটিলতা বাড়ায় না, এখন থেকে শরীরের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; যেমন—হার্ট, কিডনি, মস্তিষ্ক, ফুসফুস হুমকিতে থাকে। এ বছর এই সতর্কতার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য। অসুস্থ মুখ নানাভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, একদম শিশু থেকে বৃদ্ধ, যারা মুখের রোগকে পুষে রাখে, যেমন দাঁত শির শির করা, দাঁতে ব্যথা বা ভেঙে আছে, বিবর্ণ দাঁত, দাঁত ফেলে দেওয়ায় জায়গাটা ফাঁকা আছে, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে, দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে থাকে, খাবার চিবাতে কষ্ট, দাঁত নড়ছে, মুখে জ্বালাপোড়া, নানা রকম ক্ষত বা আলসার, দুর্গন্ধ, এলোমেলো, উঁচুনিচু বা ফাঁকা দাঁত, প্রায়শ দাঁতের গোড়া ফুলে যাওয়া ইত্যাদি রোগে সেই রোগীকে নিজের অজান্তেই নানা বিষণ্নতা বা মানসিক জটিলতার মধ্যে রাখে।
প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যকর মুখ সবার ইতিবাচকতা, মানসিক ও শারীরিক বিকাশ, আত্মসম্মানবোধ, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, জীবনযাত্রার মান, কাজে মনোযোগিতা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শক্তি, কাজে আগ্রহ, উদারতা, স্মরণশক্তি, প্রফুল্লতা, সজিবতা এবং আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মুখের যতেœ আত্মবিশ্বাসী হওয়া জরুরি, সঠিক নিয়মে নিয়মিত মুখ পরিষ্কার রাখলে মুখের সিংহভাগ রোগকে সহজে প্রতিরোধ করা যায়।
নিয়ম মেনে দাঁত পরিষ্কার—
সঠিক নিয়ম :
স্বাস্থ্য রক্ষার নানা বিষয় এখন গণমাধ্যমের প্রচেষ্টা ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় অনেকে জানছে। গ্রামপর্যায়েও দাঁতব্রাশের গুরুত্ব স্পষ্ট হচ্ছে, তবে প্রশ্ন ওঠে ব্রাশ ও পেস্টের গুণমান ও ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে। দাঁতকে সাদা করার জন্য কয়লা, ছাই বা বাজারের নানা রাসায়নিক পদার্থ; যেমন—দাঁতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি শক্ত ব্রাশ বা অধিক সময় দাঁতব্রাশেও দাঁতের প্রতিরক্ষা আবরণকে নষ্ট করে, প্রতিদিন সকালে নাস্তা ও রাতে খাওয়ার পর দুই মিনিট দাঁতের সব পৃষ্ঠ পরিষ্কার করার জন্য যথেস্ট।
সাধারণত ব্রাশ নির্বাচনে ব্রাশের মাথা গোলাকার, ব্রিসেল ছোট ও নরম আর ধরার স্থানটি অমসৃণ ও সহজ হতে হবে, ব্রিসেল সর্বোচ্চ এক ইঞ্চি লম্বা ও আধা ইঞ্চি পাশ বা প্রস্থ হলে সুবিধা। তিন থেকে চার মাস পর পর ব্রাশ পরিবর্তন করা ভালো, কখনোই এক জনের ব্রাশ অন্য কারো ব্যবহার করা উচিত নয়। টুথপেস্টের বিষয়ে ফ্লোরাইডযুক্ত পেস্ট বেছে নেওয়া যেতে পারে। কারণ এ উপাদান দাঁতক্ষয়কে প্রতিরোধ ও মজবুত করে। বাজারে নানা ধরনের পেস্ট পাওয়া যায়, কোনোটি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে, আবার কোনোটি মেডিকেডেট। মাড়ির রোগ ও অতিসংবেদনশীলতা কমাতেও নানা ধরনের পেস্ট রয়েছে। ব্রাশের ব্রিসেলের তিন ভাগের এক ভাগ পেস্ট নিলেই যথেস্ট। শিশুদের ক্ষেত্রে যতদিন সে কুলি করে পেস্ট না ফেলতে পারে, ততদিন পেস্ট ছাড়াই নরম ব্রাশ বা সুতি কাপড় ব্যবহার করা উচিত।
যাদের দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে, তারা অবশ্যই বাজারজাত ডেন্টাল ফ্লস বা ইন্টার ডেন্টাল ব্রাশের সঠিক ব্যবহার জেনে ব্যবহার করতে হবে, টুথপিক বা কোনো ধাতবকাঠি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দাঁত ব্রাশের পর আঙুল দিয়ে মাড়ি ম্যাসেজ ও ব্রাশ দিয়ে জিহ্বা পরিষ্কার রাখার বিষয়টিও নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। যাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম; যেমন—অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টে ইনহেলার ব্যবহারকারী, কেমোথেরাপি চলছে, রক্তস্বল্পতা, কিডনি রোগী তাদেরকে চিকিত্সকের পরামর্শে জীবাণুমুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করা উচিত।
দাঁতের স্বাস্থ্যবান্ধব খাবার
চিনিযুক্ত যে কোনো খাবার দাঁতের শত্রু, চিনিকে সাদা বিষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা দাঁতের ক্ষয়রোগ থেকে শুরু করে শরীরের নানা রোগের পাশাপাশি রোগ-প্রতিরোধক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর সুষম খাবার; যেমন— মৌসুমি তাজা ফরমালিনমুক্ত ফলমূল, শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ, ছোট মাছ, টক দই, দুধ, ডিম, পনিরসহ ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন সিযুক্ত খাবারকে প্রাধান্য দিতে হবে। শিশুদের কৃত্রিম জুস, আলুর চিপস্, ফাস্টফুড, চকোলেট, চুইংগাম, মিষ্টি যতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর এগুলো খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলি করার কথা বলতে হবে।
ডেন্টাল চেকআপ :যুক্তিসংগত কারণে ছয় মাস পর পর ডেন্টাল চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়, কারণ মুখের বেশির ভাগ রোগের শুরুতে বড় ধরনের কোনো উপসর্গ হয় না। রেগুলার চেকআপের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিত্সাব্যবস্থা সহজ ও স্বল্প খরচে হয়।