টাকা দিলেই অবৈধ পুকুর খনন বৈধ হয়ে যায়

সহকারী পুলিশ সুপার ও পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

প্রকাশিত: ১:২৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০২৫

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:

 

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে অবৈধ পুকুর খননকারীদের থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উল্লাপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অমৃত সূত্রধর ও তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদেরের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে খোদ পুকুর খননকারীরাই পুলিশের এএসপি ও ওসি (তদন্ত) বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের উপ-মহা পুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহানের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন ‘ আপনাকে দুইটি প্রশ্ন করি, দেখি আমার সাথে মিলে কি না। প্রথমত অবৈধ পুকুর খনন করা হলে পুলিশের করণীয় কি? দ্বিতীয়ত পুলিশ আইনত কি ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারেন?

উত্তরে প্রতিবেদক বলেন, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন- ২০২৩ অনুযায়ী এটি আমলযোগ্য অপরাধ। এই আইনের অধীনে স্থানীয় এখতিয়ারভুক্ত থানাতেই মামলা দায়ের করা যাবে। পুলিশ বিনা পরোয়ানায় অভিযুক্তকে আটক করতে পারবেন।

পরে তিনি বলেন, জনস্বার্থে আপনি নিজে বাদী হয়ে অথবা যে কোন কৌশল অবলম্বন করে থানায় অভিযোগ দায়েরের ব্যবস্থা করেন। আমি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

অভিযোগকারী তাড়াশ সদর ইউনিয়নের শ্রীকষ্নৃপুর গ্রামের মৃত সবের আলী প্রামাণিকের ছেলে মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পেশায় আমি রাজমিস্ত্রি। এ বছর প্রথম একটি পুকুর খনন করে দেওয়ার চুক্তি করি কয়েকজন জমির মালিকের সাথে। পুকুরটি হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহা সড়কের পাশে খালকুলা এলাকায়। সাধারণত রাতে পুকুর খনন করা হয়। এ মাসের ১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার রাত তিনটার দিকে এএসপি অমৃত সূত্রধর পুকুরে আসেন। তিনি আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। নয়তো মাটি কাটা ভেক্যু মেশিনের ব্যাটারি ও হাইড্রোলিক খুলে নেওয়ার কথা বলেন। আমাকে গ্রেফতারের ভয় দেখান। আমি জমি মালিকদের মোবাইল করে ডেকে নিয়ে আসি। পরে সবাই মিলে ২৫ হাজার টাকার যোগাড় করে এএসপি অমৃত সূত্রধরকে দেওয়া হয়। টাকা দিলেই অবৈধ পুকুর খনন বৈধ হয়ে যায়। মূলত তিনি অভিযান পরিচালনার নামে রাতভর ঘুরে-ঘুরে পুকুর খননকারীদের থেকে ঘুষ নেন।

সিদ্দিকুর রহমান আরও বলেন, গত মাসের ২১ তারিখ শুক্রবার তাড়াশ থানার ওসি (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের আমার কলার ধরে পুলিশ পিকআপে তোলেন। আমাকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করেন। পরে খালকুলা নর্থ বেঙ্গল সমবায় সমিতি তেলের পাম্প থেকে ২০ হাজার টাকা ধার নিয়ে তাকে দেওয়া হয়। তারা খালকুলা আশা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করে ২২শ টাকা বিল করেন। সেই টাকাও আমাকে দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে এএসপি অমৃত সূত্রধর ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের পুকুরে-পুকুরে তাণ্ডব চালান। ভেক্যু মেশিনের ব্যাটারি ও হাইড্রোলিক খুলে নেন। গাড়ি ভাংচুর করেন।

নওগাঁ ইউনিয়নের ভায়াট গ্রামের ওয়াহাব মণ্ডলের ছেলে রাঙ্গা মণ্ডল অভিযোগ করেন, তিনি ভায়াট গ্রামে পুকুর খনন করছেন। গত সোমবার রাতে এএসপি অমৃত সূত্রধর পুকুরে আসেন। তাড়াশ থানার ওসি (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদেরকেও মোবাইল করে নিয়ে আসেন। এএসপি অমৃত সূত্রধরের গাড়ি চালকের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লেনদেনের কথা হয়। আট বিঘা আয়তনের একটি পুকুরের জন্য ৮০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে ৩১ হাজার টাকায় রাজি হন। ১১ হাজার টাকা ঘটনাস্থলেই দেওয়া হয়। মঙ্গলবার থানায় গিয়ে বাকি ২০ হাজার টাকা ওসি (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদেরকে দেই। এর আগে একদিন রাত আড়াইটার দিকে ওসি (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের আমাকে গ্রেফতার করে পুলিশ পিকআপে তোলেন। সেদিন ছয় হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেন।

উল্লাপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অমৃত সূত্রধর বলেন, অবৈধ পুকুর খননের তথ্য পাওয়া গেলে আমি সেখানে যাই। পুকুর খনন বন্ধ করে দেই। এজন্য তারা আমার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার মিথ্যে অভিযোগ করছেন।

তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের বলেন, সকল কার্যক্রম সার্কেল স্যার মিটমাট করে তারপর আমাকে ডেকেছেন। আমার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। ওসি স্যার চলে যাওয়ার পর আমি দায়িত্বে রয়েছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, আমি তাড়াশে যোগদানের এক সপ্তাহ এখনো হয়নি। এরই মধ্যে পুকুরে অভিযান চালিয়েছি। ভেক্যু মেশিনের ব্যাটারি জব্দ করেছি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) না থাকায় তার দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হচ্ছে। অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. ফারুক হোসেন দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, আপনার যা বলার হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠান। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল ফোনে এসএমএস করলেও কোন জবাব পাননি প্রতিবেদক। ফোন দিলে উল্টো তিনি ফোন কেটে দেন।