টাঙ্গাইলে নদীর বুকে চলছে পুকুর খনন

প্রকাশিত: ৫:৩৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৫, ২০২৫

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি:

 

নদীর স্বভাব অবিরাম বয়ে চলা। বাধা পেলে পাড় ভাঙে, জনপদ তছনছ করে। কিন্তু নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে পুকুর খনন করায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও ঢাকার আন্তঃজেলা বংশী নদী এখন অস্তিত্ব হারানোর পথে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মোতাবেক, ২৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বংশী জামালপুরের দেওয়ানঞ্জের পুরোনো ব্রহ্মপুত্র থেকে সৃষ্ট হয়ে টাঙ্গাইল ও গাজীপুর হয়ে ঢাকার তুরাগের মোহনায় মিশেছে। ময়মনসিংহ ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে বলা হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বংশীদের নামানুসারে নদীর নামকরণ হয়। চলার পথে এ নদী টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী থেকে চাড়ালজানি পর্যন্ত তিন কিলোমিটারে ৩১টি বাঁক খেয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। গোলাবাড়ী ব্রিজের ভাটিতে লোকদেও গ্রামের অংশে একাধিক পুকুর খনন করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

পাউবোর অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আদনান হোসেন জানান, মধুপুরের গোলাবাড়ী ব্রিজ থেকে লোকদেও গ্রাম ডাইনে রেখে দক্ষিণে প্রবাহিত হওয়ার সময় ধনুক বাঁক খাওয়া বংশী বামে টাঙ্গাইল-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক ছুঁয়ে গেছে। এরই পশ্চিম প্রান্তে নদীর মাঝ বরাবর উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত বিশালকায় মাটির বাঁধ তৈরির পর তিনটি পুকুর খনন করেছেন প্রভাবশালীরা। এখানে বর্ষাকালে মাছ চাষ এবং শুষ্ক মৌসুমে বোরোর আবাদ হয়। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নদীতে পুকুর খনন করেছেন মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী ইউনিয়নের লোকদেও গ্রামের আব্দুস সামাদ গং। এদের দেখাদেখি আরো কয়েক জন নদীর ডান তীর ভরাট করে দখলে নিচ্ছেন।

পরিবেশকর্মী আবু হেনা মোস্তফা অভিযোগ করেন, নদীর বুকে পুকুর খনন, পাড় দখল এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি বাধাপ্রাপ্ত হলেও টাঙ্গাইল পাউবো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। জেলা ভূমি অফিস বেআইনি উদ্যোগ থামায়নি। তলদেশের বড় অংশ পুকুরে গ্রাস করায় বর্ষাকালে পানিপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আঞ্চলিক মহাসড়ক গ্রাস করছে। ভূমি মানচিত্রে তিন দশক আগেও আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে কমপক্ষে ৪০ গজ দূরে ছিল নদীর মূল প্রবাহ। এখন ভাঙতে ভাঙতে নদী মহাসড়কে আঘাত করছে। সওজ প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের টাকায় মহাসড়কের সুরক্ষা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত সচিব মো. শামছুল আলম চৌধুরী জানান, নদীর তলদেশে পুকুর খনন করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ সালের ৬৮/ এ ধারায় এক বছরের কারাদণ্ড, ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত তহশিলদার নজরুল ইসলাম জানান, নদীর জমি এক নং খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় তদারকির দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। আর নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পাউবোর। কিন্তু বংশীর অস্তিত্ব বিলীন হতে চললেও টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন এবং টাঙ্গাইল পাউবো কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। এ ব্যাপারে লোকদেও গ্রামের সামাদ মিয়া ও অন্যরা জানায়, নদীর তলদেশের খাসজমিতে নয়, বরং চর জেগে ওঠা নিজস্ব ভূমিতে পুকুর খনন করেছেন।

পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক কৃষিবিদ নূর উল্লাহ মিয়া জানান, বর্ষাকালে মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগ ও কৃষিপণ্য পরিবহনে বংশীর গুরুত্ব অপরিসীম। দখলে দূষণে ক্ষীণকায় বংশীর বুকে এখন পুকুর খননের মাধ্যমে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে নদীটাকে। সওজ মধুপুর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সোহেল মাহমুদ জানান, নদী বাঁক খেয়ে বাম তীরে আঘাত করায় মহাসড়ক রক্ষায় বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান জানান, বংশী নদীতে পুকুর খননের খবর তিনি জানেন না। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে খোঁজ নিয়ে দেখবেন। টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শফিকুল ইসলাম জানান, মধুপুর উপজেলা প্রশাসনকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।