
ডেস্ক রিপোর্ট:
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্রমবর্ধমান বিভক্ত সরকারকে সামলাতে তিনি ক্রমাগত সংঘাতের ওপর নির্ভর করে চলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন বলে তার বিশ্বাস। তার প্রশাসন সম্ভবত এমন ধ্যানধারণা পোষণ করে যে, গাজা বা ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান যত নির্মম-নির্দয় হবে, তত বেশি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও চরমপন্থি দলগুলো নেতানিয়াহুর দিকে ঝুঁকবে। চলমান বাস্তবতায় ঐসব দলের সমর্থন নেতানিয়াহুর ভঙ্গুর জোটের জন্য অপরিহার্য বটে
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধবাদী মনোভাবের কথা কে না জানে? এই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় যে ভয়াবহ গণহত্যা চালাচ্ছেন, তাতে করে তিনি কোনো মতাদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গি মনের মধ্যে ধারণ করেন, তা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তার যুদ্ধবাজ বক্তব্য এবং লাগাতার সামরিক অভিযানের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। এসব বিশ্লেষণ করে বেশ ভালোমতোই বোঝা যায়, নেতানিয়াহুর ‘বিপজ্জনক’ রাজনৈতিক কৌশলের ওপর থেকে পর্দা সরে যাচ্ছে!
চলমান গাজা সংঘাত কি নেতানিয়াহুর জন্য কেবলই নিরাপত্তা ইস্যু? অবশ্যই নয়। বরং এই যুদ্ধ তার এক কঠিন ও সুপরিকল্পিত কূটকৌশলের অংশ। বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশই এ বিষয়ে এক মত যে, নিজেকে কেবল রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখার জন্যই গাজা ইস্যুকে ঝুলিয়ে রেখেছেন নেতানিয়াহু! তার বিরুদ্ধে ওঠা সীমাহীন দুর্নীতির অভেযোগ, নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ঢাকতে এবং সর্বোপরি ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতেই এই সংঘাত জিইয়ে রাখতে চাইছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী।
এমন অবস্থায় স্বভাবতই নড়েচড়ে বসা উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। সত্যিই তাদের আর নীরব থাকা ঠিক হবে না। কারণ, ইসরাইলি বাহিনীর লাগামহীন সামরিক অভিযানের মুখে শুধু ফিলিস্তিনিদের জীবনই ধ্বংসযজ্ঞের নিচে চাপা পড়ছে না, বরং এর অভিঘাতে গোটা এই অঞ্চলটিই ক্রমবর্ধমানভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
সত্যি বলতে, নেতানিয়াহুর কাছে যুদ্ধ হলো ‘একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার’ মাত্র। নেতানিয়াহুর কাছে সংঘাতই শেষ ‘উপায়’ নয়, বরং তার কর্মকাণ্ড ও হাবভাব দেখে মনে হয়, নিজের শাসনক্ষমতা এবং ইসরাইলি আধিপত্যবাদী মিশনকে সুসংহত করার প্রশ্নে তিনি প্রয়োজনীয় সব কিছু করতে এক পায়ে খাড়া! এভাবেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্রমবর্ধমান বিভক্ত সরকারকে সামলাতে তিনি ক্রমাগত সংঘাতের ওপর নির্ভর করে চলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন বলে তার বিশ্বাস। তার প্রশাসন সম্ভবত এমন ধ্যানধারণা পোষণ করে যে, গাজা বা ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান যত নির্মম-নির্দয় হবে, তত বেশি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও চরমপন্থি দলগুলো নেতানিয়াহুর দিকে ঝুঁকবে। চলমান বাস্তবতায় ঐসব দলের সমর্থন নেতানিয়াহুর ভঙ্গুর জোটের জন্য অপরিহার্য বটে। অর্থাত্, গাজা যুদ্ধ যে নেতানিয়াহু প্রশাসনের সবচেয়ে কার্যকরী ‘বিভ্রান্তিমূলক কৌশল’, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই যুদ্ধ তিনি যত বেশি দীর্ঘ করতে পারবেন, তত বেশি জনগণের মনোযোগ তার ওপর থেকে সরে যাবে; তার সামনে পাহাড় হয়ে ওঠা আইনি ঝক্কিঝামেলা, অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা-সংকট এবং সর্বোপরি শাসনকার্য পরিচালনায় ব্যর্থতার গল্পগুলো চাপা পড়ে যাবে। ঠিক এমন একটি নির্মম খেলার মধে পড়ে গেছে ফিলিস্তিনিবাসী। তাদের ‘স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার’ নেতানিয়াহুর জন্য হয়ে উঠেছে নিছক ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলের অংশ।
নেতানিয়াহু সরকারের কৌশল কি কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে? না। বরং বিশেষভাবে লক্ষণীয়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি একধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতা (কনট্রোলড ডিএস্টাবলিশমেন্ট)’ নামক মতাদর্শকে অনুসরণ করে চলেছেন। এর পেছনে সম্ভবত তার লক্ষ্য হলো, গাজাকে ‘একটি স্থায়ী’ সংকটের মধ্যে ফেলে রাখা। আর এজন্যই নানা খোঁড়া অজুহাতে ফিলিস্তিনের বিদ্রোহী নেতাদের তিনি হত্যা করছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মুহুর্মুহু মিসাইল ছুড়ছেন, যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করছেন। এসবের মাধ্যমে তিনি মূলত এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করতে চাইছেন, যাতে গাজা আর কখনোই ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে না থাকে। এই জনপদ তো বটেই, গোটা অঞ্চলটাই যেন পরিণত হয় অগ্নিগর্ভে।
কেবল গাজা বা ফিলিস্তিনের স্থিতিশীলতা বিনষ্টই নয়, অবিরাম ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নেতানিয়াহু এটা নিশ্চিত করতে চাইছেন যে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধব্যবস্থা যেন একদম ভেঙে পড়ে; জনগণ যেন বিভক্ত হয়ে পড়ে; বিকল্প কোনো শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ না পায় এবং সবশেষে গাজাসহ এই এলাকা যেন হয়ে ওঠে ‘একটি উন্মুক্ত জেলখানা’। এটা করে নেতানিয়াহু প্রশাসনের কী লাভ? সম্ভবত তিনি এই মিশন নিয়ে এগোচ্ছেন যে, ঠিক তেমন একটি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন অজুহাতে ফিলিস্তিনের ওপর ইচ্ছেমতো অবরোধ আরোপের মাধ্যমে তাদের চাপে রাখা যাবে। আর তাতে করে নিজ দেশে বিশেষত ডানপন্থি ইসরাইলি নাগরিকদের পাশে পাবেন তিনি।
এর চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই কৌশলের মধ্যে নিহিত রয়েছে ‘জায়োনিস্ট (ইহুদিবাদী)’ মতাদর্শের এক সুদূরপ্রসারী নীলনকশা। ইসরাইলের এবারকার মিশন সম্ভবত গাজার ‘জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’। তারা পরিকল্পিতভাবে গাজার হাসপাতাল ও বিদ্যালয়সহ অবকাঠামোগত খাত একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে কঠোর অবরোধ তো আছেই। এভাবে ধ্বংসলীলার মাধ্যমে তেলআবিব এমন এক মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে চাইছে, যা ফিলিস্তিনিদের জীবনযাপনকে অসম্ভব করে তুলবে। নেতানিয়াহু এবং তার কট্টরপন্থি মিত্ররা খুব ভালো করেই জানেন যে, মাত্র এক রাতের ব্যবধানে গাজার জনগণকে উচ্ছেদ করে এই ভূখণ্ড করায়ত্ত করা যাবে না। আর তাই তারা এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, যেখানে ক্ষুধা, রোগব্যাধি এবং গৃহহীনতা বা বাস্তুচ্যুতি হয়ে উঠবে স্বাভাবিক বাস্তবতা; অর্থাত্, নেতানিয়াহুর কর্মপরিকল্পনা কেবল মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি একটি ‘সুপরিকল্পিত জাতিগত নির্মূলকরণ’ মিশন!
ক্ষমতাসীন নেতানিয়াহু গাজায় এখন পর্যন্ত যে মাত্রায় দমনপীড়ন ও সামরিক অপারেশন চালিয়েছেন, তা কল্পনাকেও হার মানায়। বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনির ওপর অযাচিত অবরোধের খড়্গ চাপিয়ে রেখেছে তারা। এর ফলে গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা যেখানে আগে থেকেই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, ইসরাইলি সর্বাত্মক হামলার কারণে তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। গাজার হাসপাতালগুলোতে এখন কেবলই আহতদের ঢল, যাদের মধ্যে রয়েছে অজস্র নারী ও শিশু। ইসরাইলি বিমান হামলায় মারাত্মক আহত এসব মানুষকে চিকিত্সা দিতে গিয়ে অবর্ণনীয় প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন চিকিত্সক ও নার্সরা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই তাদের এই কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে যে, কাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে, আর কাকে মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। কী বীভত্স সেই দৃশ্য!
হাসপাতালের বাইরের অবস্থাও একই রকম ভয়াবহ। সুপরিকল্পিতভাবে পানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। গাজাবাসীরা এখন ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাগুলো থেকেও বঞ্চিত। বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগবালাই। খাদ্যসংকট চরমে উঠেছে; অধিকাংশ রাতেই ক্ষুধার্ত শিশুরা ঘুমাতে যাচ্ছে একমুঠো খাদ্যের প্রহর গুনতে গুনতে। শুধু কি খাবার, গাজার হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ বাড়িঘরের চিহ্নমাত্র নেই। ধ্বংসস্তূপের আখ্যানের চেয়েও এই যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা হলো, গাজার ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে নির্মূল করে দেওয়া হচ্ছে যেন! এই যুদ্ধে নিহত এবং আহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। তাছাড়া যারা এখনো জীবিত আছে, ক্রমাগত বোমাবর্ষণের কারণে তাদের ওপর চরম মানসিক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, এই ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে পড়ে ফিলিস্তিনি শিশুরা ব্যাপক ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছে, যা একটি ট্রমাগ্রস্ত প্রজন্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ফিলিস্তিনকে। কঠিন পরিতাপের বিষয় হলো, গাজার শিশুরা যেন এমন একটা দিন দেখেনি, যেই দিনটা ‘সংঘাতহীন, শান্ত’ ছিল। ‘শান্তি’ যেন সত্যিই তাদের কাছে এক ভিনগ্রহের বস্তু!
নিরাপত্তার অজুহাতে এভাবে যখন ফিলিস্তিনের গোটা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে, তখনো অপ্রত্যাশিতভাবে নীরব বিশ্বসম্প্রদায়! যদিও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই গাজাবাসীর সংগ্রাম ও প্রতিরোধ। তারা নিজ দেশের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার উপলক্ষ্য খুঁজে নিচ্ছে; ধ্বংসস্তূূপের দেওয়াল জুড়ে নানা চিত্রকর্মের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের। ফিলিস্তিনিদের জীবনে এ যেন সত্যিই এক মহাকাব্যিক অধ্যায়!