নানা সংকটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

প্রকাশিত: ১:৫০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৫, ২০২৫

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের ভরসার স্থান ৫০ শয্যার উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫টি ইসিজি যন্ত্রের চারটি ছয় মাসের বেশি সময় বিকল হয়ে পড়ে আছে। ডিজিটাল আল্ট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রটির প্রিন্টারও অকেজো। একমাত্র এক্সরে যন্ত্রটির ব্যবহারও সীমিত। সার্জারি চিকিৎসক না থাকায় সব ধরনের অপারেশন (ওটি) কার্যক্রম এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ।

 

ফলে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ উপজেলার মানুষরা। এ ছাড়া চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকটে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

এখানে ১৬ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন এবং ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের বিপরীতে একজন রয়েছেন। উপজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতালটিতে গাইনি, শিশু ও মেডিসিন, নাক, কান ও গলাবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এছাড়া ল্যাব টেকনিশিয়ানের তিনটি ও অফিস সহায়কের ৫টি পদ ফাঁকা। ৩ জন ওয়ার্ড বয়ের বিপরীতে আছেন একজন, ৩৬টি নার্স পদের মধ্যে ৩৩ জন রয়েছেন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৫ জনের মধ্যে আছেন একজন। হাসপাতালে দুজন আয়া থাকার কথা থাকলেও একজনও নেই। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন এবং ইউনিয়নে ৬ জন মিলে মোট ৮ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ৬ জন রয়েছে। এসব উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার দিয়ে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, ৫টি ইসিজি যন্ত্রের ৪টি বিকল হয়ে পড়ে আছে। একমাত্র সচল পুরাতন ইসিজি যন্ত্রটি জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে। ডিজিটাল আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রটির প্রিন্টার নষ্ট। জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসকরা আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট কম্পিউটারে দেখে রোগ নির্ণয় করছেন। প্রিন্ট রিপোর্ট না পাওয়ায় সেটির কার্যকারিতা নিয়ে রোগীদের প্রশ্ন রয়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে সার্জারি চিকিৎসক না থাকায় সব ধরনের অপারেশন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। তবে জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের ওয়ার্ড বয় ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারকে ফোঁড়া অপারেশন করতে দেখা গেছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা কেউ পরীক্ষণ যন্ত্র না থাকায় ফিরে যাচ্ছেন আবার কেউ কেউ বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাচ্ছেন।

উপজেলার থেতরাই ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আনিছুর হক (৬৫) বলেন, হার্নিয়ার সমস্যা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছি। বহির্বিভাগীয় রোগীর টিকিট করার পর জানতে পারি এখানে অপারেশন করার চিকিৎসক নেই। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আমাকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, ‘এতো বড় হাসপাতালে অপারেশন করার ডাক্তার নেই। গরিব মানুষ তাই বেশি টাকা নিয়ে আসিনি। বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে ঈদের পর অপারেশন করাব।’

উপজেলার ধরণীবাড়ি ইউনিয়নের মাঝবিল গ্রামের লুৎফর রহমান (৬৭) এজমাজনিত সমস্যায় পাঁচ দিন আগে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন থেকে এজমায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে পাঁচ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হই। এখনো কাশতে কাশতে দম বন্ধ হয়ে আসে। ডাক্তাররা ইসিজি করতে বলেছেন। কিন্তু হাসপাতালের ইসিজি যন্ত্র নষ্ট। শরীর দুর্বল তাই বাইরের ক্লিনিকে যাইনি। মরি বাঁচি এই হাসপাতালেই থাকব। আল্লাহ ভরসা।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মেহেরুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকটের কারণে রোগীদের সেবা পেতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। একজন ওয়ার্ড বয় জরুরি বিভাবে ফোঁড়া অপারেশন করতে পারে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি এখানের ভারপ্রাপ্ত আরএমও, ফুল আরএমও নই। তাই এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। আপনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন। তিনি সব উত্তর দিতে পারবেন।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক বাসিন্দাদের এই হাসপাতালে ১৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন এবং ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের বিপরীতে ১ জন রয়েছেন। ওয়ার্ড বয়, আয়া, যন্ত্রপাতি, অ্যাম্বুলেন্সসহ সব পর্যায়ে সংকট রয়েছে। দৈনিক বহির্বিভাগে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন এবং অন্তঃবিভাগে প্রায় ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এতো সংকট নিয়ে বিপুল জনসংখ্যার সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। ছয় মাস আগে ইসিজি যন্ত্র মেরামতের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এখনো কোন খবর নেই।

ওয়ার্ড বয় জরুরি বিভাবে ফোঁড়া অপারেশন করতে পারে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হাসপাতালে সার্জারি চিকিৎসক না থাকায় সব ধরনের অপারেশন বন্ধ আছে। অনেক সময় রোগীর অনুরোধে ছোট ছোট অপারেশন জরুরি বিভাগে হয়। তবে ওয়ার্ড বয় সেসব করে না। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।