প্রতিশ্রুত গ্যাস না পেয়ে ব্যাহত বিদ্যুৎ উৎপাদন

প্রকাশিত: ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২৫

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

 

  • লোডশেডিং ও খরচ বাড়ছে
    দৈনিক কমপক্ষে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেট্রোবাংলাকে পিডিবির চিঠি

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিশ্রুত গ্যাস দিতে পারছে না পেট্রোবাংলা। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সার্বিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্পে, বাণিজ্যে এবং আবাসিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের বিদ্যুৎ উৎপাদনে মাসভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের একটি পরিকল্পনা পেট্রোবাংলা তৈরি করে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা ও জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনা করে পিডিবি। ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে চলতি মার্চ মাসে দৈনিক গড়ে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু দৈনিক গড়ে ৯৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে লক্ষ্য ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না পিডিবি।

গত ১১ মার্চ পেট্রোবাংলায় দেওয়া এক চিঠিতে পিডিবি জানায়, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পেয়ে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। সরকারের বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ব্যয় কমানোর কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা এভাবে ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া জ্বালানি তেলের (ডিজেল ও ফার্নেস তেল) মজুত-সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই বিদ্যমান পরিমাণের সঙ্গে আরও ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করা হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর লোড বাড়ানো বা চালু করে সংকট মোকাবিলা করা যাবে।

পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্র্বতী সরকার যতটুকু সম্ভব ঘাটতি পূরণ করে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত বকেয়া ও বড় ঘাটতি সহজেই মেটানো যাচ্ছে না। জ্বালানি ঘাটতির মূল কারণ নগদ অর্থের (টাকা ও ডলার) সংকট। তাই এলএনজি আমদানিতে এবং স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে—দুই দিকেই কমতি ও ঘাটতি চলছে। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বকেয়াও আদায় করতে পারছে না পেট্রোবাংলা। এলএনজি আমদানির জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে পাওনাও পরিশোধ করতে পারছে না।

গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর দৈনিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার ৬৭৭ মেগাওয়াট। বর্তমানে গ্যাস থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। গরমে গ্যাস থেকে ৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে পেট্রোবাংলার ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এর বিপরীতে এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ১০০ কোটি ঘনফুটের মতো।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আসন্ন গরমকালে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত চার কার্গো এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই চার কার্গো এলএনজি আনতে খরচ হবে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পিডিবি থেকে এই টাকা না পেলে এলএনজি আমদানি করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, গত বছরের গ্রীষ্মে পেট্রোবাংলা বিদ্যুতের জন্য ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে। এবার আমরা ১২০ কোটি ঘনফুট দিতে বলেছি। এজন্য টাকা দেওয়ার বিষয়ে আমরা কোনো নিশ্চয়তা দিইনি। তবে ভর্তুকির টাকা পেলে তা পরিশোধ করা হবে বলে পেট্রোবাংলাকে জানানো হয়েছে।

এদিকে দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে পিডিবি। সংস্থাটির সচিব রাশেদুল হক প্রধান স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়, আরপিসিএল ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের লোড বৃদ্ধি করে ময়মনসিংহ এলাকার ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে। চাঁদপুর ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের লোড বৃদ্ধি করে কুমিল্লা এলাকার ঘাটতি পূরণ করা; ঘোড়াশাল কেন্দ্রের লোড বৃদ্ধি করে জোনাল ব্যালান্সিং বৃদ্ধি করা; মেঘনাঘাট এলাকার সামিট ৫৮৩ মেগাওয়াট, ইউনিক ৫৮৩ মেগাওয়াট, জেরা ৭১৮ মেগাওয়াটের যে কোনো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে ঢাকা এলাকার নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি করা; ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে লোড বৃদ্ধি করে জোনাল লোড ব্যালান্সিং ও সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করা; সিরাজগঞ্জ ইউনিট-২ এ ২২৫ মেগাওয়াট চালু করে সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করা; সিরাজগঞ্জ ইউনিট-১ এর ২২৫ মেগাওয়াট ও ইউনিট-৩ থেকে ২২৫ মেগাওয়াটের লোড বৃদ্ধি করে সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

এদিকে পিডিবির দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন রিপোর্ট অনুযায়ী গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় ঐ দিন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৩৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদিত হয় ১৪ হাজার ৪২৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এ দিন ঐ সময়ে সাব স্টেশন পর্যায়ে ১১৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। গ্রাহক পর্যায়ে লোডশেডিং আরও বেশি।