
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
আমরা সবাই খেলোয়াড়। খাট আমাদের স্টেডিয়াম, বালিশ আমাদের ট্রেনিং গিয়ার, আর টিভি-মোবাইল আমাদের কোচ। শুয়ে শুয়ে আমরা বিশ্বসেরা ফুটবলার, ক্রিকেটার, টেনিস চ্যাম্পিয়ন, হকি, ব্যাডমিন্টন সবই আয়ত্তে! এমনকি অলিম্পিক জিমন্যাস্ট!
এ জিমন্যাস্টিক শুধু খাটে সীমাবদ্ধ থাকলে তো ঠিক ছিল, বাস্তবেও রোজ ট্রেনিং চলে! বাস ধরার স্ট্যান্ড, ট্রেনে চড়ার মারামারি, লাইনে দাঁড়িয়ে ওজন তোলার কসরত, সব মিলিয়ে নিখুঁত অ্যাথলেট তৈরির এক লুকানো জাতীয় প্রকল্প! এর সঙ্গে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকে ধ্যান! নিষ্পলক তাকিয়ে অনড় জ্যাম দেখা আর মাঝে মাঝে মোবাইল গুঁতানো ছাড়া আর কোনো ভূমিকা থাকে। বড় বড় সাধকরাও একটানা এত দীর্ঘ সময় ধরে সাধন করতে পারে না। কিন্তু আমরা পারি!
তবে এটা ঠিক যে, খেলা মানেই সব সময় অ্যাকশন নয়, আমরা উপদেশ দিয়েও খেলি! টিভির সামনে বসে বলে দিই—‘এই শটটা কি মারো? ছয় মারতে হবে!’ ক্রিকেটের ভাষায় আমরা সবাই কোচ, ফুটবলের ভাষায় সেরা সমালোচক।
বাস্তবে মাঠে নেমে খেলার দরকার কী? খাটের ওপর বসেই বিশ্বজয়ী অ্যাথলিট হওয়া যায়! যাহোক, খেলা নিয়ে আমাদের প্রত্যেকের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। অনেকেই ছোটবেলায় খেলোয়াড় হওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেকে আবার খেলোয়াড় হতে না পেরে মাঠে গিয়ে অন্য খেলোয়াড়ের জন্য হাততালি দিয়েছেন। কেউ হয়তো জীবনে কখনো খেলার সুযোগই পাননি।
খেলা-খেলোয়াড়ের কথা উঠলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে মাঠের সেই উত্তেজনা, জয়ের উল্লাস আর হেরে যাওয়ার বেদনা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাঠে এই খেলার নিয়ম একটু আলাদা। এখানে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যারা নিজেদের সব সময় চ্যাম্পিয়ন টিমের সদস্য ভাবেন, যদিও তাদের পারফরম্যান্স বলছে অন্য কথা।
খেলা ও খেলোয়াড়—এ দুইটি শব্দ কেবল ক্রীড়াজগতেই নয়, আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বহুলব্যবহূত। মাঠের খেলোয়াড়, ড্রেসিংরুমের খেলোয়াড়, গ্যালারির সমর্থক, সবাই মিলে খেলাটাকে জমিয়ে তোলেন। কিন্তু সমস্যাটা হয় তখন, যখন কেউ নিজেকে চ্যাম্পিয়ন লিগের তারকা ভেবে বসেন, অথচ বাস্তবে তিনি সি-টিমের বেঞ্চ গরম করারও যোগ্য নন!
বাংলাদেশের কিছু খেলোয়াড় রয়েছেন, যারা নিজেরাই জানেন তারা কোন লেভেলের খেলোয়াড়। কিন্তু কিছু প্লেয়ার আছেন, যারা মাঠে বলের নাগাল না পেলেও নিজেকে মেসি-রোনালদো ভাবতে ভালোবাসেন। এরা ‘গলির কিংবদন্তি’, নিজেদের এলাকায় অপরাজেয়, কিন্তু বড় ম্যাচে সুযোগ পেলে পেনাল্টির বলও গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন!
আমাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও এমন খেলোয়াড়ের অভাব নেই। কেউ কেউ মনে করেন, তারা জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অথচ তাদের ড্রিবলিং দেখলে বোঝা যায়, তারা এখনো ফুটবলকে হ্যান্ডবলের মতো খেলছেন! আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাঠে নামতে হলে শুধু ‘জার্সি পরে’ কাজ হয় না, দক্ষতাও লাগে। বড় মাঠে খেলার জন্য দরকার কৌশল, সহনশীলতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা এক মজার মন্তব্য করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ দুনিয়ার মাঠে খেলার খেলোয়াড়, ছোট মাঠে খেলার খেলোয়াড় না।’ কথাটা শুনে মনে হলো, বাংলাদেশ যেন বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে নামছে, অথচ আমরা জানি, আমাদের অবস্থান এখনো প্রাথমিক লিগে!
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার এই মন্তব্য যেন ধন্দে ফেলে দেয়। আমরা যখন দেখি— ভারত, আমেরিকা, চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন, তখন মনে হয়, আমরা আসলেই বিশ্বমাঠে খেলছি, নাকি ছোট মাঠেই আটকে আছি! যেমন ধরুন, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। একদিকে বন্ধুত্ব, অন্যদিকে সীমান্তে গুলি বিনিময়। এটা যেন এক ধরনের ‘ফ্রেন্ডশিপ গেম’, যেখানে জিতলে বন্ধুত্ব, হেরে গেলে গুলি!
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য শুনে অনেকে গর্বিত বোধ করেছেন, কারণ এতে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবতা কি সত্যিই এমন? বিশ্বরাজনীতির মাঠে বাংলাদেশ কি সত্যিই বড় খেলোয়াড়, নাকি মাঝেমধ্যে সুযোগ পেয়ে গোলবারে লাগানো একটা শটেই আমাদের ক্যারিয়ার হাইলাইট হয়ে থাকে?
বাংলাদেশ অবশ্যই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু এটাও সত্য যে, আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের অবস্থান এখনো বেশ নড়বড়ে। বড় দলে খেলতে হলে কেবল আত্মবিশ্বাস থাকলেই হয় না, দরকার নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৌশলগত চাল এবং প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বোঝার ক্ষমতা।
আমাদের অনেক খেলোয়াড় স্থানীয় রাজনীতিতে তুখোড়, বক্তৃতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মিডিয়াতে আলোচিত, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের ভূমিকা কমেডির পর্যায়ে পড়ে! আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যখন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আলোচিত হয়, তখন আমাদের বড় মাঠের খেলোয়াড়রা কেবল ‘নিন্দা জানিয়ে’ দায় সারেন।
অন্যদিকে, গলির খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস কিন্তু আকাশচুম্বী! ছোট গণ্ডির মধ্যেই তারা একে অন্যকে বাহবা দেন, নিজ দলের ভুলগুলো না দেখে অন্য দলের কৌশল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বাস্তবে তারা হয়তো পাড়ার টুর্নামেন্টের ফাইনালেও উঠতে পারবেন না, তবু তাদের মনে হয়, বিশ্বকাপের শিরোপা একেবারে হাতের নাগালে।
বাংলাদেশ কি দুনিয়ার মাঠের খেলোয়াড়? উত্তর একেবারে নির্দিষ্টভাবে দেওয়া কঠিন। কারণ কিছু ক্ষেত্রে আমরা সত্যিই বড় খেলোয়াড়ের মতো পারফরম করেছি, আবার কিছু ক্ষেত্রে ছোট গলির খেলোয়াড়ের মতো আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মঘাতী গোল করেছি!
কিছু মানুষ আছেন, যারা সব সময় চ্যাম্পিয়ন টিমের স্বপ্ন দেখেন। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে তার জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি; যেমন ধরুন, রোহিঙ্গা-সংকট। এই সমস্যার সমাধানে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চাইছি, কিন্তু সেই সমর্থন মিলছে না। এটা যেন এমন একটি ম্যাচ, যেখানে রেফারি আমাদের পক্ষে নেই, আর প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা সবাই বিশ্বকাপ জেতা!
তবে একটা জিনিস নিশ্চিত, নিজেকে বড় খেলোয়াড় ভাবলেই বড় মাঠে খেলা যায় না। সেখানে যেতে হলে শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, দক্ষতাও থাকতে হয়। নইলে ‘বিশ্বমঞ্চের প্লেয়ার’ হওয়ার স্বপ্ন দেখা যাবে ঠিকই, কিন্তু বড় ম্যাচে সুযোগ পেলে গলির কিংবদন্তিদের মতোই বল হারিয়ে হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়তে হবে!
প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্য যেন আমাদের জন্য একটি রসিকতার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমাদের আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবতাও মেনে নিতে হবে। আমরা যদি ছোট মাঠে ভালো খেলতে শিখি, তবেই বিশ্বমাঠে আমাদের জায়গা তৈরি হবে। আর যারা এখনই নিজেদের চ্যাম্পিয়ন টিমের সদস্য ভাবছেন, তাদের জন্য বলি, ‘আত্মবিশ্বাস ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিপজ্জনক!’
তাই, আসুন আমরা ছোট মাঠে ভালো খেলি, বিশ্বমাঠে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি, কিন্তু বাস্তবতাকে কখনো ভুলে না যাই। কারণ, খেলায় জিততে হলে শুধু আত্মবিশ্বাসই নয়, দক্ষতা, পরিশ্রম এবং বাস্তবতার সমন্বয়ও প্রয়োজন!