
রাজশাহী প্রতিনিধি:
চলমান খরা ও মৃদু তাপপ্রবাহে গাছে গাছে ঝুলে থাকা বিপুল সম্ভাবনার আমের গুটি শুকিয়ে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা
ক্যালেন্ডারের হিসাবে আর দুই মাস পর (মে’র শেষে) বাজারে নামবে রাজশাহী অঞ্চলের সুস্বাদু আম। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে অধিকাংশ বাগানে শোভা পাচ্ছে আমের গুটি। এদিকে চৈত্রের শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলে দুই দফায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আমের জন্য ভালো ইঙ্গিত বয়ে আনলেও ঈদুল ফিতরের এক সপ্তাহ আগে থেকে চলমান খরা ও মৃদু তাপপ্রবাহ আম উৎপাদনের জন্য অশনিসংকেত বলে জানিয়েছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, এবার বৃহত্তর রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহীর বাগানে কলমের ছোট ও মাঝারি শতভাগ গাছে যেমন মুকুল এসেছিল, তেমনি শোভা পাচ্ছে আমের গুটি। বাগানের সবচেয়ে ছোট গাছের গুটি মটরদানার আকারে শোভা পাচ্ছে। বাগানের অধিকাংশ বড় গাছে আমের মুকুল ও গুটি হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম। ইতিমধ্যে খরার কারণে বাগানের গুটি আম শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অভিজ্ঞ কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে খরায় আমের গুটি ঝরে পড়া বন্ধে বাগানে সেচসহ বিভিন্ন পরিচর্যা চলছে। এছাড়া ক্ষতিকর পোকা দমনে বাগানে কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের আমচাষি আব্দুল হান্নান বলেন, খরা ও মৃদু তাপপ্রবাহ ছাড়া এখন পর্যন্ত আবহাওয়া আমের অনুকূলে রয়েছে। তিনি বলেন, খরা থেকে আমের গুটি রক্ষা ও বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার আমের বাম্পার ফলন হতে পারে।
আলাপে সংশ্লিষ্টরা বলেন, এবার আম মৌসুমের অন ইয়ার। অর্থাৎ বেশি ফলনের বছর। দ্রুত শীতকালের বিদায় হওয়ায় ৯০ শতাংশের বেশি গাছে মুকুল আসে। ঘন কুয়াশা কম থাকায় এবার মুকুলের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে চলমান খরা ও মৃদু তাপপ্রবাহে গাছে গাছে ঝুলে থাকা বিপুল সম্ভাবনার আমের গুটি শুকিয়ে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের আট জেলার প্রায় ৯৩ হাজার হেক্টর আমবাগান মুকুল ও গুটিতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহী জেলার ৮৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর এবং জয়পুরহাট, নাটোর, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ৫ হাজার ৩৯৬ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে সোয়া ১১ লাখ
মেট্রিক টন আম উৎপাদন এবং ১০ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহীর পুঠিয়ার আমচাষি মাহবুব আলম বলেন, তার ১০ বিঘার আমবাগান রয়েছে। গত ১৭ এবং ২০ ও ২১ মার্চের সামান্য গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আমপাতা ও গুটি ধুলাবালি মুক্ত হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, তাতে আমের গুটি ঝরে পড়া কমবে। কিন্তু তার পরের খরা ও মৃদু তাপপ্রবাহের কারণে এখন গুটি ঝরে পড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, অন ইয়ারে বাগানে প্রচুর মুকুল হওয়ায় এবার আমে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমের বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন ও বিদেশে রপ্তানি বাড়াতে হবে। রাজশাহী ফল গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, আমের গুটি ঝরে পড়া বন্ধ ও ক্ষতিকর পোকা দমনে বাগানে সেচের পাশাপাশি কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভালো ফলনের আশায় সংশ্লিষ্টরা বাগান পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। রাজশাহী কৃষি বিভাগের উপপরিচালক উম্মে সালমা বলেন, গাছে এখনো যে পরিমাণ গুটি রয়েছে, বড় দুর্যোগ না হলে আমের বাম্পার ফলন হবে। এতে আমচাষি ও সংশ্লিষ্টরা লাভবান হবেন।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষির অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, আম উৎপাদনে উচ্চ এবং নিম্ন ফলনশীল বছর স্বাভাবিকভাবে পর্যায়ক্রমে ঘটে। গত বছর শীতকাল দীর্ঘ হওয়ায় আমের মুকুল দেরিতে আসে। যার প্রভাব উৎপাদনে পড়ে। এবার শীতকাল সংক্ষিপ্ত হওয়ায় আগাম মুকুলের আগমন বেশি ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।