
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
সংবিধান ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের অধিকাংশ সুপারিশে ভিন্নমত জানিয়েছে বিএনপি। দলটি জানিয়েছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা খর্বের সুপারিশ তারা মানে না। তবে দলটি বিচার বিভাগ সংস্কারের ২৩ সুপারিশের সবকটিতে, দুদক সংস্কারের ২০ সুপারিশের ১৯টিতে একমত এবং আংশিক একমত। জনপ্রশাসন সংস্কারের ২৬ প্রস্তাবের অর্ধেকে একমত আছে।
একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধানে প্রস্তাবনায় এককাতারে রাখা সমীচীন মনে করে না বিএনপি। দলটি ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে সংবিধানের প্রস্তাবনা ও মূলনীতি যেভাবে ছিল, তা পুনর্বহাল চায়।
তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। নবগঠিত দলটি পাঁচটি সংস্কার কমিশনের ১৬৬ সুপারিশের ১১৩টিতে একমত জানিয়েছে। আংশিক একমত ২৯ সুপারিশে। বাকি ২২ সুপারিশে ভিন্নমত জানিয়েছে।
গতকাল রোববার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে দল দুটি আলাদাভাবে এসব মতামত জানিয়েছে। একই দিন কমিশনকে মতামত জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাসদ (মার্কসবাদী)। গতকালই ছিল ঈদের আগে শেষ সংলাপ। আগামী ৭ এপ্রিল নাগরিক ঐক্য ও ৮ এপ্রিল এবি পার্টির সঙ্গে সংলাপ করবে কমিশন।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করে। সাতটি কমিশন ইতোমধ্যে সুপারিশ জমা দিয়েছে। সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় ঐকমত্য কমিশন।
সুপারিশের ৭০টি সংবিধান-সংক্রান্ত, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার-সংক্রান্ত ২৭টি, বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত ২৩টি, জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত ২৬টি ও দুর্নীতি দমন কমিশন-সংক্রান্ত ২০টি। এই ১৬৬ সুপারিশের ওপর রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়া হচ্ছে। সুপারিশে একমত, আংশিক একমত ও ভিন্নমত ‘টিক’ চিহ্ন দিয়ে জানাতে ‘স্প্রেডশিট’ দেওয়া হয়। তবে বিএনপি দুটি কমিশনের সুপারিশে বিস্তারিত লিখিত মতামত দিয়েছে। বাকি তিন কমিশনের বিষয়ে পরে জানাবে বলে জানিয়েছে। এনসিপি পাঁচটি কমিশনের সুপারিশেই লিখিত মতামত জানিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল দুপুরে সংসদ ভবনে ঐকমত্য কমিশনের কো-চেয়ারম্যান ড. আলী রীয়াজের কাছে দলীয় মতামত তুলে দেন। এ সময় কমিশন সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, ফতেখারুজ্জামান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান ছিলেন।
সংস্কার বাস্তবায়নে ‘নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশের মাধ্যমে’, ‘নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে’, ‘নির্বাচনের সময় গণভোটের মাধ্যমে’, ‘গণপরিষদের মাধ্যমে’, ‘নির্বাচনের পরে সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে’ এবং ‘গণপরিষদ ও আইনসভা হিসেবে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে’ ছয়টি বিকল্প দিয়েছিল কমিশন। বিএনপি কোনটি বেছে নিয়েছে, তা জানা যায়নি। মনির হায়দার সমকালকে বলেন, বিএনপির দেওয়া মতামত ঈদের ছুটির পর খুলে দেখা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান সংশোধনের কিছু প্রস্তাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা খর্ব হবে– তা মানে না বিএনপি। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের আদলে নিম্ন আদালতের জন্য ‘লোয়ার জুডিশিয়ারি’ প্রস্তাব করেছে দলটি।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের ৭০ সুপারিশ থাকলেও স্প্রেডশিটে ৫৭টি পেয়েছেন জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এতে সংবিধানের প্রস্তাবনার উল্লেখ নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে একই কাতারে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে আনাকে সমীচীন মনে করে না বিএনপি। অভ্যুত্থান সংবিধানের অন্য জায়গায় কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা পরে আলোচনা করা যায়।
গণপরিষদ ও গণভোট নির্বাচন নয়
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন রাষ্ট্রে সংবিধান রচনায় গণপরিষদ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের সংবিধান আছে। এর গণতান্ত্রিক চরিত্র বিনষ্ট হওয়ায় যার জন্য রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণে সংবিধানের ব্যাপক সংশোধনীর প্রস্তাব রয়েছে। যারা গণপরিষদ দাবি করছে, তারাও ৬৯টি প্রস্তাব দিয়েছে। বিএনপি ৬৩ প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহত্তর ঐকমত্যে সংবিধানের ব্যাপক সংশোধন হতে পারে। একে নতুন সংবিধান বলতে পারেন। সংশোধিত সংবিধানকে তারা সেকেন্ড রিপাবলিক বলতে চাইলে বলতে পারে। কিন্তু তাদের চিন্তা পুরো জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
গণভোটের দাবি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ সংশোধনে গণভোটের প্রয়োজন হবে। নতুন সংবিধান সংস্কারের আলাপ-আলোচনায় আরও কোনো বিধান যদি গণভোটের অধীনে নিয়ে আসা হয়, তখন দেখা যাবে। তবে এখন সংসদ নির্বাচনই করা উচিত, গণভোট নয়।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুদক সংস্কারে ২০ সুপারিশের ১১টিতে একমত এবং আটটিতে নীতিগতভাবে একমত। আয়কর-সংক্রান্ত সুপারিশে ভিন্নমত রয়েছে, আইনের সংশোধন প্রয়োজন।
জনপ্রশাসন সংস্কারের ২৬ সুপারিশের ১৩টিতে একমত জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, বাকিগুলো নিয়ে আলোচনায় একটি জায়গায় আসা যাবে। কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে এসএসবি বাতিলে একমত নয় বিএনপি। মন্ত্রিপরিষদ কমিটি গঠনের মাধ্যমে পদোন্নতি হলে রাজনীতিকীকরণ হতে পারে।
বিচার বিভাগের ২৩ প্রস্তাবের সঙ্গেই বিএনপি একমত জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গভাবে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টে রাখার প্রস্তাব করেছে বিএনপি।
সংবিধান ও নির্বাচন সংস্কারে ভিন্নমত
সালাহউদ্দিন বলেন, নির্বাচন সংস্কারের ২৭ সুপারিশের অধিকাংশ সংবিধান সংশোধন-সংশ্লিষ্ট। এনআইডি, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতেই থাকা উচিত। সংসদীয় কমিটির কাছে নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করার সুপারিশের বদলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করার মতামত দিয়েছে বিএনপি।
দেশের সাংবিধানিক নাম ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ করার সুপারিশ করেছে কমিশন। এতে সায় না দিয়ে বিএনপি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বহাল রাখার মত দিয়েছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং উচ্চকক্ষে আসন ও মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গেও ভিন্নমত পোষণ করেছেন বলে জানান সালাহউদ্দিন। নিম্নকক্ষে নারীদের আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার সুপারিশে একমত হলেও নির্বাচনের পদ্ধতিতে ভিন্নমত রয়েছে বিএনপির।
এনসিপি গণভোট, দ্বিকক্ষের সংসদ চায়
এনসিপি মতামতে বলেছে, যেসব সুপারিশ সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, সেগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে অন্তর্র্বতী সরকার। আর সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কারে গণপরিষদ নির্বাচন প্রয়োজন।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক সারোয়ার তুষার এ অবস্থান জানিয়েছেন। এ সময় সংস্কার সমন্বয় কমিটির সদস্য মুনিরা শারমিন, জাবেদ রাশিম, আরমান হোসাইন ও সালেউদ্দিন সিফাত উপস্থিত ছিলেন।
সারোয়ার তুষার বলেন, ২২ সুপারিশে ভিন্নমতের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এনসিপি দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের সুপারিশে একমত। তবে নির্বাচনের আগেই উচ্চকক্ষের প্রার্থী কারা, তা দলগুলোকে ঘোষণা করতে হবে। কারণ, ভোটারের জানার অধিকার আছে উচ্চকক্ষে কারা যাচ্ছেন।
এনসিপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন। তবে তা বাধ্যতামূলক না করার প্রস্তাব তারা দিয়েছে। নির্বাচনকালীন অন্তর্র্বতী সরকারের মেয়াদ হতে পারে ৭০ থেকে ৭৫ দিন। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) দায়িত্ব সরকার নেবে।