২৫ মার্চের কালরাত ও গণহত্যা দিবস

প্রকাশিত: ৪:৪০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৫, ২০২৫

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

আজ ২৫ মার্চ, গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাক-হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ভয়াল সেই রাতে ঘটেছিল বিশ্ব-ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মরণে ও গণহত্যা দিবস পালনের লক্ষ্যে এবারও সারা দেশে আজ রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১০টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত এক মিনিটের প্রতীকী ব্ল্যাক আউট (কেপিআই/জরুরি স্থাপনা ব্যতীত) পালন করা হচ্ছে।

২৫ মার্চ এই দিন পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান একটি বিমানে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের পূর্ব পরিকল্পিত পোড়া মাটি নীতি বাস্তবায়ন শুরু করে। সে সময় জেনারেল টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না’। ফলে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে বিভীষিকাময় ভয়াল কালরাত্রি। ২৫ মার্চ কালরাতে শুরু হওয়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে সে সময় চলমান অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিন। সেদিন সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। মধ্যরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক নিয়ে ‘আরেশন সার্চ লাইট’-এর নামে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা এবং রাজারবাগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, বাঙালি পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায়। সে সময় ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ঢাকার পরিস্থিতির বাস্তব বিবরণ তুলে ধরেন, যা পরে প্রকাশিত হয়। এছাড়া মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাড ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’-এ পাকিস্তানের বর্বরতার নিন্দা জানান।

১৯৭১ সালের ১৩ জুন পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস যুক্তরাজ্যের ‘দি সানডে টাইস’ পত্রিকায় বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতার বাস্তব চিত্রনির্ভর একটি বিস্তারিত নিবন্ধ প্রকাশ করেন। যা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টি ত্বরান্বিত করে। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ ভয়াল রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেই রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হলো আরো ৩০০০ লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। এর পর সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট। লুট আর ধ্বংস যেন তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুনতাড়িত শ্মশানভূমি।’

১৯৭১ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমি দৈনিক ইত্তেফাকের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা এবং দৈনিক আজাদীর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতাম। ২৫ মার্চ সারা দিন ও সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে রাত এগারোটায় আমি দৈনিক আজাদী অফিসে গেলাম রাত একটার দিকে। আমরা সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এমপি সাহেবের কাছে গেলে তিনি ঢাকা থেকে টেলিপ্রিন্টারে আসা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত ইংরেজি টেক্সট দেখালেন এবং বললেন : ‘ঢাকায় ম্যাসাকার (গণহত্যা) হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আমাদের সামনে আলজেরিয়া ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘ স্বাধীনতার যুদ্ধ।’ রাত তখন ১টা ১০ মিনিট। অর্থাত্ সেটা তখন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর।

আজাদী অর্ফিসের নিচে আন্দরকিল্লায় দেখলাম ২-৩ হাজার ছাত্র-জনতার সমাবেশে তদানীন্তন ছাত্রলীগের শীর্ষনেতা জনাব এস এম ইউসুফ আন্দরকিল্লায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার যে লিফলেট বিলি করা হচ্ছিল, সেখানে দি পিপল-এর এক সাংবাদিক বললেন যে, কাল রাতে পাহাড়তলি অয়ারলেস অফিসের ইঞ্জিনিয়ারিং সুপারভাইজার মো. নুরুল আমিন ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ রিসিভ করেন। সেখান থেকে জনাব আমিনের ভাই নন্দন কানন অয়ারলেস অফিসের অয়ারলেস অপারেটর এবং ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের’ চট্টগ্রাম টিএন্ডটি’র মহাসচিব জনাব মাহতাব উদ্দিনকে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ তত্ক্ষণাত্ দিয়ে দেন। জনাব মাহতাব উদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাদের ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের বেঙ্গল রেজিমেন্টকে উক্ত মেসেজ দিয়ে দেন। আওয়ামী লীগ নেতারা উক্ত অয়ারলেস মেসেজের কপি নিয়ে সারা শহরে বিতরণ করেছেন। স্বাধীনতা ঘোষণার সেই কাগজ এখানে বিলি হচ্ছে।

২৬ মার্চ ভোরে চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম, জি এস আব্দুর রব এবং যুবলীগ নেতা এস এম ইউসুফসহ আমি আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে গেলাম। সেখানে অবস্থানরত গার্ডদের কাছে জানাল যে, আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ নেতা জনাব এম এ হান্নান, এমএনএ সকালে সেখানে এসেছিলেন। কিন্তু রেডিও বন্ধ থাকায় তিনি আগ্রাবাদ কলোনি অবস্থিত রেডিও ইঞ্জিনিয়ার জনাব আবদুস সোবহানের বাসায় গেছেন। সেখানে গিয়ে জানলাম জনাব এম এ হান্নান, এমএনএ জনাব সোবহানকে নিয়ে কালুরঘাটে গেছেন। আগ্রাবাদ কলোনিতে রেডিও ইঞ্জিনিয়ার জনাব আবদুর শাকেরের সঙ্গে আমাদের দেখা হলো। তিনি বললেন যে, তার অন্যান্য সহকর্মী জনাব শরফুজ্জামান, জনাব রাশেদুল হাসান এবং আমিনুর রহমানদের নিয়ে তারা কালুরঘাটে যাচ্ছেন এবং সেখান থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রচার শুরু করবেন।

আমরা সেখান থেকে ফিরে জুপিটার হাউজে আসি এবং সম্পাদক সাহেবসহ সব নেতাকে দেখতে পাই। তাকে জানাই যে, এম এ হান্নান সাহেব রেডিও ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান সাহেবকে নিয়ে কালুরঘাটে গেছেন। যথার্থই দুপুর থেকে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ভিপি ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের নেতা জনাব আবুল কাশেম সন্দ্বীপ-এর কণ্ঠস্বরে চট্টগ্রামবাসী প্রথম শুনতে পেলেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’, ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’, ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’। সন্দ্বীপের কণ্ঠে বেতারের নাম তিন বার ঘোষণার পর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা জনাব এম এ হান্নান, এমএনএ-এর নাম ঘোষণা করে বলা হলো তিনি এখন একটি বিশেষ ঘোষণা দেবেন। জনাব হান্নান তার জলদ গম্ভীর কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর উক্ত স্বাধীনতা ঘোষণা দেশবাসীর উদ্দেশে প্রচার করে শোনালেন।

বাংলাদেশ সরকার ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে এটি ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এখন আমাদের উচিত এই দিনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথাযথভাবে প্রচার করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৫ মার্চের ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণহত্যার তথ্য প্রচার করা। বিশ্বদরবারে ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য প্রবাসী ভাইসহ সবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। আমাদের মনে রাখতে হবে শহিদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। তাদের স্মৃতিকে তাই চিরজাগরুক রাখতে হবে।