অভিযোগ বা দাবির কিছু উত্তর খোঁজা জরুরি

প্রকাশিত: ১:৩৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২৫

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

 

অনেকেই রাজপথে, মাঠে-ঘাটে, অনলাইনে নানাবিধ বিব্রতকর বাক্য ছড়াচ্ছেন। অথচ তারা ভুলে যাচ্ছেন আমাদের সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভুলে যাচ্ছেন তারা, সেনাবাহিনী প্রধান একজন ব্যক্তি নন, তার পদটি একটি প্রতিষ্ঠান। সুতরাং তিনি পদাধিকারেই একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কুতর্ক রচনা করলে বাংলাদেশ আঘাত পায়, আঘাত পায় এ দেশের সার্বভৌমত্বের শক্তি

কখনো সময় আসে জাতির সামনে যখন যদি কিন্তু, অথবা দিয়ে কথা না বলে সরাসরি দৃঢ়তায় কথা বলতে হয়, প্রশ্ন করতে হয় পিনপয়েন্টে। কেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে? কে করছে এসব এবং কার ইশারায়, এ দেশের জনগণের জানার, বুঝবার অধিকার আছে। নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার আছে দেশের সাহসী সৈনিকদের পাশে দাঁড়াবার, তাদের বুকে জড়িয়ে ধরার, যারা দেশকে রক্ষা করতে এই দুঃসময়ে রাত-দিন পরিশ্রম করছেন। নিশ্চয়ই সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি দৃপ্তভাবে আমার দেশের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব এবং সেনাবাহিনীর পাশে। আর তক্ষুনি প্রশ্ন জাগরিত হয়, এখনকার কোনো কোনো তরুণ নেতৃবৃন্দের নানাবিধ কর্মকাণ্ড ঘিরে। কী চায় তারা? বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা কি তারা দেখতে চায় না?

সম্প্রতি তরুণ নেতার ফেসবুক পোস্ট নিয়ে ঝড় উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ লুটপাটের কবল থেকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে দেশকে আরেকটি স্তরে নিতে যে কয়েক জন তরুণ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি সেই সাহসীদের তালিকার একজন। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে আসা জনতা তাকেও দিয়েছিল অফুরন্ত ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা পোক্ত করতে তাদের সরাসরি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাশে থেকেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান। সেনাবাহিনীর সঠিক নেতৃত্ব না হলে আগস্টের রক্তাক্ত দিনগুলো আরো বেদনার্ত হয়ে উঠত। সেই সংকটের উত্তরণে নিঃসন্দেহে কাণ্ডারির ভূমিকা রেখেছেন জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান এবং সতীর্থ কমান্ডাররা। অথচ তাকেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ করতে পিছপা হচ্ছে না আগস্ট অভ্যুত্থানের অনেক কলাকুশলি। অনেকেই রাজপথে, মাঠে-ঘাটে, অনলাইনে নানাবিধ বিব্রতকর বাক্য ছড়াচ্ছেন। অথচ তারা ভুলে যাচ্ছেন আমাদের সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভুলে যাচ্ছেন তারা, সেনাবাহিনী প্রধান একজন ব্যক্তিনন, তার পদটি একটি প্রতিষ্ঠান। সুতরাং তিনি পদাধিকারেই একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কুতর্ক রচনা করলে বাংলাদেশ আঘাত পায়, আঘাত পায় এ দেশের সার্বভৌমত্বের শক্তি।

তরুণ নেতার ফেসবুকে কী পোস্ট করেছেন তা এখন সবার জানা। পুনরুল্লেখের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার কাছে অনভিপ্রেত মনে হয়েছে তার এই অভিযোগ! কেন? এর সারমর্ম দাঁড়ায়, সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইছে, আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতি করার সুযোগ দিতে, যার নেতৃত্বে থাকবে না শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্য। আপন রক্ত। এ পর্যন্ত বুঝলাম। গণতান্ত্রিক ধারা মানেই প্রশ্ন করো, উত্তর খোঁজো। তৈরি করো নতুন ন্যারেটিভ অথবা আগের ন্যারেটিভের যৌক্তিক মীমাংসা নির্ণয় করো। সে প্রেক্ষিতেই স্বাভাবিক ধারায় কিন্তু কিছু প্রশ্ন চলে আসে।

ধরা যাক হাসনাত ও তার দুই বন্ধু এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভেতর একটি আলোচনা হয়েছে। কবে হয়েছে? হাসনাত বলেছেন ১১ মার্চ। তাহলে দশ দিন পর ২১ মার্চ কেন তা প্রকাশ করা? কী উদ্দেশ্যে এই দশ দিন তা গোপন রাখা? আবার কী উদ্দেশ্যেই সেটি জনগণের সামনে এনে সামরিক বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পেশাগত জায়গাটিকে এখন প্রশ্নবিদ্ধ করা? সবটাই বড়ই ধোঁয়াশা। এমন ধরনের ধোঁয়ার মধ্যে অনেক বিপদ ওত পেতে থাকে। সে বিপদ হলো, নিজের দেশকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া।

এমন আলোচনাটি ছিল কনফিডেনশিয়াল মতবিনিময়। তাহলে এটি প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে কি এথিকস লঙ্ঘিত হলো না? নেতা হতে গেলে হতে হয় ধীরস্থির, প্রজ্ঞাবান এবং নিজের মাঝে সৃষ্টি করতে হয় গভীরতা। কিন্তু এখানে দেখছি সেসব অনুপস্থিত।

প্রশ্ন থাকতে পারে, আপনাকে কি কেউ ক্যান্টনমেন্টে ডেকেছিল, নাকি নিজে স্বেচ্ছায় সেখানে গিয়েছিলেন? এর ব্যাখ্যা কিন্তু দেননি। মিডিয়া এ নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করছিল, খুব সতর্কতায় ধোঁয়াশা তৈরি করে আপনি এড়িয়ে গেছেন, দেখেছি। বিশেষ সূত্র থেকে জানা যায়, রেকর্ড আছে যে, কেউ সেখানে কাউকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নেননি। তাহলে এখন ঐ আলোচনাকে অন্যদিকে মোড় ঘুরানোর চেষ্টা কেন?

দ্বিতীয় আরেকটি প্রশ্ন হলো, আপনার এই প্রকাশিত বক্তব্য কি আপনার রাজনৈতিক দল এনসিপির, নাকি একান্তই ব্যক্তিগত? আপনি কি এনসিপির অন্য নেতৃবৃন্দকে জানিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন? লক্ষ করছি, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই। আরো লক্ষ করছি, যেদিন হাসনাত পোস্টটি করলেন, ঠিক একই দিনে এই সরকারের ক্রীড়াবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ভিডিও মেসেজ ছেড়েছেন এই বলে, সেনাবাহিনী প্রধান চাননি প্রফেসর ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা করতে। এ কথা তো গত আগস্টের। কিন্তু সাত মাস ঠিক একই সময়ে এই দুটি বক্তব্য কেন দেওয়া হলো?

সব দেখে আর শুনে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের নাগরিকেরা গোয়েন্দা কাহিনির সামনে। এদেশের নাগরিকেরা যেন আর বিশুদ্ধ রাজনীতির দেখা পাচ্ছেন না। গত রাতে, শুক্রবারে, ইউটিউব দেখলাম পিনাকী ভট্টাচার্য্য, ইলিয়াস এবং কনক সারায়োর মিলে গল্প করছে। সেখানে পিনাকী বাবু বলছে, ‘হাসনাতকে যখন জিগ্যেস করলাম, তুমি কেন তোমার এই গোপন মিটিংয়ের কথা আমাকে জানাও নাই’? হাসনাত বলেন, ‘দাদা আমি রাজনীতি বুঝি না। খেয়াল করিনি বলতে হবে। যখন যা মাথায় আসে বলে ফেলি।’ হাসনাতের বিশ্বস্ত উচ্চারিত এমন সত্য কথা শোনার পর সত্যিই হতভম্ভ হয়েছি। ভাবছি, কী করে একজন তরুণ নেতা এমন দায়িত্বহীন কথা বলতে পারে, যিনি কি না আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে চান? তাহলে কি প্রশ্ন উঠে আসবে না, তার কাছে বাংলাদেশের রাজনীতি বা সেনাবাহিনীর অবস্থান বা সেনাবাহিনীর মর্যাদা কতটুকু বজায় থাকবে?

হাসনাতের এই পোস্টের পর দেশের রাজপথে আবার অস্থিরতা। এনসিপি জমায়েত করছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ঠেকাতে। সে না হয় করল, কিন্তু এই জাতীয় জমায়েত থেকে তারা বিরতিহীনভাবে সেনাবাহিনী প্রধানকে তথা সেনাবাহিনীকে টার্গেট করে অপবাদ ও আঘাত করেই চলেছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি তৈরি হলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এটা কি কোনো দেশপ্রেমিকের কাম্য হতে পারে? পারে না। কিন্তু তারা তো সবাই মুক্তমনে গঠনমূলকভাবে চিন্তা করছে না।

হাসনাতদের যারা পেছন থেকে উসকিয়ে দিচ্ছেন, তারা বসবাস করেন উন্নত বিশ্বে। আমেরিকায়, ফ্রান্সে। যেখানে তাদরে জীবন সুখের, আয়েশের। তারা ইউটিউবে এসে দেশের জন্যে কেঁদে বুক ভাসায় এবং দেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র জনতাকে ঠেলে দেয় সংঘাতে। এতে তাদের কী যায় আসে? কিছুই ক্ষতি নেই তাদের। তারা নিজে ও তাদের পরিবার নিয়ে বাস করে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশে। কিন্তু যে কোনো বিশৃঙ্খলায় ভুগতে হয় হতভাগা দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী জনগণের। এখন রমজান মাস। হাসনাত এবং তাদের গুরুজনের ক্রোধে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়তে পারে, সে কথা কি তারা ভাবে? মোটেও না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে হলেও রাজপথে আন্দোলনের সময় এখন নয়।

তাদের এই আন্দোলন এমন তো হতে পারে বাংলাদেশের বিরুদ্ধ শক্তিতে সুযোগ করে দিতে পারে আমাদের বড় মাপের বিপদ ঘটাতে, বাংলাদেশকে দুর্বল করতে? এমন হলে লাভ কার? এমন নয় তো, সবার অলক্ষ্যে এ লাভ ক্ষমতা থেকে পতিত আওয়ামী লীগের পকেটে ঢুকবে, যে দলের নেতারা লুটপাটের অর্থে বিদেশে আয়েশে আছে? এমন হলে কি লাভ অন্য দেশের, যারা কি না আমাদের ভালো চায় না? খুব কি খারাপ শোনাবে যদি প্রশ্ন করি, রাজনীতি কম বোঝা হাসনাতের এমন উদ্দেশ্য কি আছে, ঐসব কালো শক্তিকে সহায়তা করার? এখানে একটা কথা বলা খুবই প্রাসঙ্গিক। আমার এ লেখা যদি পোস্টদাতার চোখে পড়ে, ভাববে নিশ্চয়ই হাজারো সুবিধাবাদীর মতো আমিও কিন্তু বলি, আমি ছিলাম জাপানি আর জার্মান দূতাবাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা, সব মিলিয়ে সিকি শতাব্দী। কিন্তু আজও না আছে বাড়ি, না আছে গাড়ি। বয়সটা ৬৪ পেরোলো। আপনার মতো আমিও পড়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আশির দশকের শুরুর দিক। বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সঙ্ঘের সে জন্যই এটুকু বলতে চাই, যা বলছি নিজের সব রকম সততা নিয়ে দেশ আর জনগণের প্রয়োজনে বলছি। একজন প্রবীণ প্রাজ্ঞজন হিসেবে তরুণদের বলছি, ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে, এই বাংলাদেশ সব দিক থেকে ভেঙে পড়তে পারে। ভূলুণ্ঠিত হতে পারে এ দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার।