
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
*সব ইউনিটকে সক্রিয় করা হয়েছে: পুলিশ সদর দপ্তর
*ঢাকায় চুরি-ছিনতাই বাড়তে পারে: নগর বিশেষজ্ঞ
ঈদের লম্বা ছুটি শুরু হচ্ছে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে। দীর্ঘ এই ছুটিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হবে? ছুটির সময়ে রাজধানী ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে যায়। আর লম্বা ছুটিতে ঘরমুখী মানুষ নানা প্রতারণা ও অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শঙ্কা আছে সারা দেশের নিরাপত্তা নিয়ে।
তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এবার ঈদকেন্দ্রিক নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। সারা দেশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ছাড়াও আনসার সদস্যরা এ সময় মাঠে থাকবে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. নাসিমুল গনি গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে ঈদকে সামনে রেখে সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিয়োজিত রয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মহাসড়কের নিরাপত্তা এবার নড়বড়ে। মহাসড়কে এমনিতেই ডাকাতি হচ্ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলে একার ডাকাতের কবলে পড়ার আশঙ্কা আছে। আর লম্বা ছুটির কারণে ঢাকা থেকে ধাপে ধাপে মানুষ ঢাকার বাইরে যাবে। তাই শুধু তিন-চার দিনের জন্য নিরাপত্তা বাড়ালে হবে না। আরেকটি বিষয় হলো যেভাবে ছিনতাই হচ্ছে তাতে ঈদের ঘরমুখী মানুষ বাসা থেকে বাস, রেল বা লঞ্চ স্টেশন পর্যন্ত নিরাপদে যেতে পারেন কী না তাও আশঙ্কার বিষয়। এর বাইরে ঈদের সময় অজ্ঞান পার্টি, প্রতারক দল, টানা পার্টি, মলম পার্টিসহ নানা ধরনের অপরাধীরা সক্রিয় থাকে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, এবার ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে কমপক্ষে দেড় কোটি মানুষ ঈদের সময় যার যার এলাকায় যাবেন। লম্বা ছুটি হওয়ার কারণে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এই ঈদে শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। পুলিশের হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৭৪টি। আগের মাস জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ৭১। অথচ গত বছরের প্রথম দুই মাসে সারা দেশে ডাকাতির ঘটনা ছিল ৬২টি। অর্থাৎ ডাকাতি অনেক বেড়েছে। সারা দেশে মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনের একটি তালিকা করেছে হাইওয়ে পুলিশ।
‘জোর তৎপরতায়’ রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘অনেকটাই উন্নতি’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। সোমবার ডিএমপি সদর দপ্তরে এক সমন্বয় সভায় তিনি বলেন, পুলিশি তৎপরতায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা অনেকাংশে কমে গেছে। ঢাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখা, সুষ্ঠুভাবে ঈদের নামাজ সম্পন্ন করা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এই সভা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, ঈদকে সামনে রেখে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট হাইওয়ে পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশকে বিশেষভাবে সক্রিয় করা হয়েছে। সারা দেশেই গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়কে ডাকাতি রোধে বিশেভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে। আর চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাত্রী ও জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই সময়ে প্রতারক চক্র অনেক বেশি সক্রিয় হয়। সেদিকেও বিশেষ নজর রয়েছে পুলিশের।
এবার সড়ক পরিবহন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নগরের প্রতিটি বাস, রেল ও লঞ্চ টার্মিনালে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাচ্ছে। এর মাধ্যমে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পর্যবেক্ষণ করবেন। নগর বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এবার লম্বা ছুটিতে সবচেয়ে আশঙ্কা ঢাকা মহানগরীকে নিয়ে। কারণ এবার অনেকই ঢাকা ছাড়বেন। তাই বাসাবাড়ি ফাঁকা থাকবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও অনেক দিন ধরে বন্ধ থাকবে। আর এই ফাঁকা শহরে অপরাধ বিশেষ করে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে যেতে পারে। কারণ এবার পুলিশের অবস্থাও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকটাই নড়বড়ে।
তবে এবার প্রথম বারের মতো নগরীর নিরাপত্তায় পুলিশের সঙ্গে মাঠে থাকছে ৪২৬ জন অক্সিলারি পুলিশ। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এলাকার নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. তালেবুর রহমান বলেন, অক্সিলারি পুলিশ এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তারা পুলিশের সহায়ক হিসাবে কাজ করবে, তথ্য দেবে এবং অপরাধীদের আটকে সহায়তা করবে। এরা মূলত ঈদের সময় বাসাবাড়ি, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় কাজ করবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশি টহল ও চেকপোস্ট বৃদ্ধি করেছে। র্যাবের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখা থেকে জানানো হয়েছে, ঈদে মানুষের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা কার্যক্রম ও টহল জোরদার করা হয়েছে। এ সময় ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকে র্যাব গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা তৎপর থাকবে। র্যাব জানিয়েছে, ঈদে নিরাপত্তায় গোয়েন্দা, ফুট প্যাট্রল, মোবাইল প্যাট্রল, সাইবার ওয়ার্ল্ডের নজরদারি থাকবে।